Skip to content

About

 

ছোটোবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল আমি লেখক হবো! কিন্তু কেন লেখক হবো? লেখক হলে কী করতে হয়? অর্থাত একজন লেখকের নৈতিক দায়িত্ব কী হওয়া উচিত? সবই অজানা ছিল; কিন্তু লিখতে খুব ভালো লাগত; বিভিন্ন বিষয়ে ভিন্নভাবে লেখার চেষ্টা তখন থেকেই মনের মধ্যে বেশ খেলা করত। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াকালীন থেকেই আমার লেখালেখির জগতে পদসঞ্চালন, ছোটোগল্প দিয়ে। সুদীর্ঘ সময় একাগ্রচিত্তে সাহিত্য সাধনায় নিয়োজিত থেকেছি অথচ নিজেকে প্রকাশ করতে চাইনি সহজে।

জীবনের সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে এই পড়া ও লেখালেখির অভ্যাস আমার জীবন থেকে প্রায় সবকিছুই কেড়ে নিয়েছে; কেবল বইয়ের পাতার মুগ্ধময় গন্ধ আর কল্পনার জগতে ঘুরে ঘুরে কিছু লেখালেখির চেষ্টাটুকু কেড়ে নিতে পারেনি। এখন প্রশ্ন হলোÑ কেন আমি লিখি? এর এক কথায় উত্তরÑ আমি লিখি না, আমাকে লিখতে হয়। যদি প্রশ্ন করা হয়Ñ কেন আমাকে লিখতে হয়?

অল্প কথায় এর উত্তর দেয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। আমি মনে করি, ‘পড়ালেখা’ শব্দটিকে দেখলেই এর আড়ালে জ্ঞানার্জনের বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। অর্থাত পড়ালেখার মতো জ্ঞানার্জনের এমন সহজ ও উন্নত পথ দ্বিতীয়টি আর দেখি না। তবে এর সাথে ধ্যান ও দর্শনের বিরাট যোগসূত্র যে রয়েছে, তা পরে জানতে পেরেছি।

বিশ্ব—জগতই এগিয়ে যাচ্ছে মূলত মানুষের মস্তিস্কে অর্জিত জ্ঞান—রকেটের যাত্রী হয়ে। ছোটোবেলা থেকেই বাবার সান্নিধ্যে থাকতে পেরে সুযোগ পেলেই বাবাকে প্রশ্ন করে বসতাম! এটা কী? ওটা কী? এটা কেন হলো? কীভাবে হলো; ইত্যাদি… ইত্যাদি… একজন শিক্ষক হিসেবে তাঁকে কিন্তু জবাব দিতেই হতো।

ছোটোবেলা থেকেই বাবাকে দেখতামÑ সারাদিন বই নিয়ে পড়ে থাকতেন। বাড়িতে বইয়ের জন্য আলাদা একটি আলমারিই ছিল, দুএকশত বই হয়তো তখন ছিল। গ্রামের সব বয়সের পাঠকগণ এখান থেকে বই নিয়ে পড়তো, কয়েক অশতিপর বৃদ্ধাও এসে বঙ্কিম চন্দ্র, শরত চন্দ্র, ঈশ্বর বিদ্যাসাগরের বই পড়তো।

এছাড়াও চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই বাবার স্কুল লাইব্রেরিটির দায়িত্ব অবসরে আসার আগ পর্যন্ত কেউ বাবার কাছ থেকে নিতে পারেনি। এক কথায় বইয়ের সাথে আমাদের একটি পারিবারিক সুসম্পর্ক তখন থেকেই প্রবাহমান। বর্তমানে ওই ছোটো লাইব্রেরিটি একটি বড় ঘর দখল করে আছে; প্রতিনিয়তই বইয়ের আমদানি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তখনো আমি বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি কি না, তা মনে নেই; তবে স্পষ্ট মনে পড়ে যে, ওই সময় থেকেই ¯্রষ্টা—সৃষ্টি, আকাশ—প্রকৃতি, বিশ্ব—ব্রহ্মাণ্ড, জীবন ও জগতের রহস্য, পৃথিবীর ইতিহাস, জীব তথা মানুষের ইতিহাস নিয়েই বেশিরভাগ প্রশ্ন করা হতো। বাবার কাছ থেকে প্রাপ্ত উত্তর ওই সময়ে আমাকে সন্তুষ্টির সীমাবদ্ধতার লাগম দিয়ে রাখলেও, একসময় এসে ওই লাগাম ছিঁড়ে যায়। তখন থেকেই বইয়ের পেছনে দেঁৗড়ঝাপ; বর্তমান সময়ে যোগ হয়েছে ইন্টারনেট।

ওই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে গিয়েÑ জীবনের একটা বিশাল সময় অতিবাহিত করেছি গুরুবাদ ও আধ্যাত্মবাদের রহস্যে ঝাঁপ দিয়ে, আমি মিশে গিয়েছিলাম ফকির—সন্ন্যাসীদের সঙ্গে; দরবেশদের আঁখড়া—আস্তানায় অনেক রাত কাটিয়ে ওদের সাধন—ভজন প্রত্যক্ষ করেছি। গ্রাম থেকে মাইলখানেক দূরে, নদীতীরবতীর্ জনহীন গোরস্থানে অগণিত রাত কাটিয়েছি নিজের মাঝে নিজেকে ডুবিয়ে দিয়ে; পাশাপাশি ধর্ম—দর্শন, বিজ্ঞান ও ইতিহাসের জগত ভ্রমণ করেছি পুস্তকের পৃষ্ঠা ওল্টিয়ে ওল্টিয়ে…! কিন্তু তাতে আরো বেশি প্রশ্নের সামনাসামনি হতে হয়েছে আমাকে।

যা—ই হোক, আমার অর্জিত জ্ঞান ও ধ্যানের চেতনাবোধ দ্বারা অন্যকে প্রভাবিত করে একটি পরিপূর্ণ শুদ্ধ, আলোকিত, নিমোর্হ, স্বাধীন ও মুক্তমনা মানবতাবোধ তৈরি করাই মূলত আমার লেখিলেখির পেছনে ছুটে বেড়ানো।

বর্তমান বিশ্ব—সাহিত্যে আমাদের বাংলা সাহিত্য সম্মানজনক অবস্থানে নেই। রক্ত দিয়ে মাতৃভাষাকে রক্ষার খ্যাতিটুকু একমাত্র আমাদের থাকলেও, আমরা ভাষাকে ওই পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারিনি। আমি ব্যক্তিগতভাবে গৌরবাহ্নিত বাংলাবাসী হিসেবে বাংলা ভাষাকে চর্চার মধ্যদিয়ে আরাধনা করে থাকি। ভাষার আরাধনা কেবল বলা কিংবা পড়ার মধ্যেই শেষ নয়, লেখালেখিও অন্যতম একটি আরাধনার পথ। তাই নিয়মিত শুদ্ধ ও সঠিক চর্চার মধ্যদিয়ে বাংলা ভাষাকে সেবাদান করাও বাঙালি হিসেবে কর্তব্যের দাস হয়ে আমাকে লেখালেখির চেষ্টা করতে হয়। এছাড়াও বিশ্বব্যাপি মানুষে মানুষে বৈষম্যতা, পূঁজিবাদ, আদিপত্য বিস্তারে যুদ্ধ—বিগ্রহ, সামাজিক অনাচার, কুসংস্কার, গেঁাড়ামি, বৈশ্বিক চক্রান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অন্যতম কার্যকরী মাধ্যম হলো লেখালেখি; তাই আমাকে লিখতে হয়। সকলের কাছে করজোড়ে বিনয়ার্দ্রে আবেদনÑ আমাকে শুভাশীস দিয়ে ধন্য করার জন্য।

বিনয়ান্তে

 

আহমেদ উল্লাহ্

Comments are closed.